Header Ads

Header ADS

উপক্রমণিকা।


উপক্রমণিকা


পৃথিবীতে সর্ব্বোৎকৃষ্ট পদার্থ কি ? এই প্রশ্নের উত্তর করিতে গিয়া সর্ব্বকালে, সৰ্ব্বদেশে, সমস্ত জ্ঞানী ব্যক্তি এক বাক্যে উত্তর করিয়াছেন, যে “ধৰ্ম্মই সর্ব্বোৎকৃষ্ট পদার্থ”। বস্তুতঃ আদিম কালাবধি বৰ্ত্তমান কাল পৰ্য্যন্ত মানব বুদ্ধির অকাট্য ও চরম সিদ্ধান্ত এই যে, জগতে ধৰ্ম্মই সার পদার্থ । কি বেদ, কি বাইবে, কি পুরাণ, কি কোরাণ, সকল দেশের সকল ভাষায় রচিত সর্ব্ব প্রকার প্রধান শাস্ত্রই ধর্ম্মের উৎ- কৃষ্টতা প্রখ্যানের নিমিত্ত উদ্ভূত হইয়াছে ৷

ধর্ম্মের নিমিত্ত প্রতিবৎসর, প্রতিমাসে, প্রতিদিন, এমন কি সূক্ষ্ম রূপে অনুসন্ধান করিলে, প্রতিমুহূর্তে, পৃথিবীতে কত সহস্ৰ মুদ্রা ব্যয়িত হইতেছে, তাহার সংখ্যা নাই ৷ কত শত মহাভয়ঙ্কর যুদ্ধ কেবল ধর্ম্মরক্ষার নিমিত্ত ঘটিয়াছে। পৃথিবীতে কত শত বা কত সহস্ৰ ব্যক্তি কেবল ধর্ম্মের নিমিত্ত সহাস্য- বদনে প্রাণ বিসর্জ্জন করিয়াছে ! এবং বোধ হয় চিরকালই এইরূপ করিবে। ইহা অপেক্ষা ধর্ম্মের সারবত্ত্বা ও উৎকৃষ্টতা

বিষয়ে আর কি অকাট্য উদাহরণ প্রদর্শন করা যাইতে পারে । ফলতঃ অনিত্য ঐহিক সুখ অপেক্ষা অনন্ত গুণে উৎকৃষ্ট পারত্রিক সুখের নিদান স্বরূপ ধর্ম্ম পদার্থ যে সর্ব্বোৎকৃষ্ট হইবে, ইহা এক প্রকার স্বতঃসিদ্ধ ; ইহা প্রতিপন্ন করিবার নিমিত্ত প্রমাণ প্রয়োগের আবশ্যকতাই হয় না।

প্রকৃতপক্ষে মানবজাতি যে পশ্বাদি ইতর জন্তু অপেক্ষা অত্যুন্নত পদবীতে অধিরূঢ় হইয়াছে, ধৰ্ম্ম-প্রবৃত্তি স্বরূপ অমূল্য রত্নে বিভূষিত হওয়াই তাহার সর্ব্ব প্রধান কারণ । চিন্তা শক্তি, বাক্শক্তি ও তীক্ষ্ণতর বুদ্ধি বৃত্তি, তাহার সাহায্যকারী মাত্র। নীতি-শাস্ত্র-বেত্তারা ধর্মহীন মানবকে পশুজাতির অভিন্নরূপ গণ্য করেন ।

“ আহারনিদ্রাভয়মৈথুনঞ্চ

সামান্যমেতৎ পশুভির্নরাণাম ।

ধৰ্ম্মোহি তেষামধিকো বিশেষো

ধর্ম্মেণ হীনাঃ পশুভিঃ সমানাঃ ॥

""

(অর্থাৎ ) আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুন, এই চতুর্বিধ কাৰ্য্যে পশুজাতির সহিত মানবজাতির প্রভেদ নাই। ঐ কাৰ্য্য- চতুষ্টয় উভয় জাতীয় জীবের সাধারণ ধর্ম্ম । কেবল ধৰ্ম্ম কাৰ্য্য বিষয়েই মানব জাতির বিশেষ প্রভেদ আছে। ধৰ্ম্মহীন মানব পশুতুল্য । সুতরাং ধৰ্ম্ম এমন উৎকৃষ্ট পদার্থ বটে, কিন্তু পৃথিবীস্থ সর্ব্বপ্রকার মনুষ্যের সকল অবস্থায় ধর্ম্মের উৎকর্ষ সমানরূপে প্রতীয়মান হয় না । যে পর্য্যন্ত মনুষ্যের জীবিকানির্বাহের স্থিরতা না হয়, যাবৎ শারীরিক শক্তি বিলক্ষণ প্রবল এবং ইন্দ্রিয়গণ সবল ও কাম-ক্রোধাদি নিকৃষ্ট প্রবৃত্তি সকল বলবতী থাকে, তাবৎ প্রায় মনুষ্যগণের ধর্ম প্রবৃত্তির উদ্রেক হয় না । আবার, যে পর্য্যন্ত মানবমনে কিঞ্চিৎ জ্ঞানের স্ফুৰ্ত্তি দৃষ্ট না হয়, সে পর্য্যন্ত ধৰ্ম্ম প্রবৃত্তিরও স্ফূর্ত্তি দৃষ্ট হয় না। জঠরানল-দগ্ধব্যক্তিকে লোভ-রিপুর সংযম বিষয়ে এবং প্রবলতর শারীরিক শক্তিমান ব্যক্তিকে “অন্যের নিকট প্রহৃত হইবে, তথাপি অন্যকে প্রহার করিবে না, ” এতাদৃশ বিষয়ে, অথবা যে পূর্ণযৌবন ব্যক্তির কাম-ক্রোধাদি নিকৃষ্ট প্রবৃত্তি প্রবল রূপে স্ব স্ব বিষয় অধিকার করিতে উদ্যত হইয়াছে, বিষয়ে তাহাকে বিষয় ভোগ-জনিত সুখের নিকৃষ্টতা উপদেশ প্রদান করিলে, তাহা উহাদিগের মনের নিকটেও যাইতে পারে না ; কেবল কর্ণে তিলার্দ্ধ বিশ্রাম করে মাত্র আবার নিতান্ত অবোধ শিশুকে যদি এরূপ উপদেশ দেওয়া যায় যে, গুরুতর ব্যক্তিকে প্রণাম করিয়া তদীয় পদধূলি গ্রহণ করা অতি কৰ্ত্তব্য কর্ম্ম, তবে সেই শিশু উন্মত্ত-প্রলাপবৎ আমাদিগের ঐ উপদেশবাক্যকে অগ্রাহ্য করিয়া হয়ত সেই গুরুতর ব্যক্তিকে সেই ক্ষণেই পদাঘাত পূৰ্ব্বক ক্রীড়া প্ৰদৰ্শন করিবে । উল্লিখিত রূপে সময়-বিশেষে বা পাত্র-বিশেষে মনুষ্য- দিগের ধর্ম্ম-প্রবৃত্তির উদ্রেক হইতেই দেখা যায় না ৷ কিন্তু যখন সংসারের অধিকাংশ বাধার অতিক্রম হয়, যখন মনুষ্য- গণ জীবিকা নির্বাহের স্থিরতা দেখিতে পান, যখন বার্দ্ধক্য-বশতঃ শারীরিক শক্তি, ইন্দ্রিয়গণের প্রবলতা ও নিকৃষ্ট প্রবৃত্তি সকল হ্রাস প্রাপ্ত হয়, এবং আপনা হইতেই আপনার পরাধীনতা বা অন্যের সাহায্য-সাপেক্ষতা অনুভব হয়, তখনই লোকের ধর্ম্মপ্রবৃত্তির উদ্রেক হয়। ধনবান্ ব্যক্তিগণ যখন উৎকৃষ্ট খাদ্যপেয়াদি উপভোগ পূর্ব্বক নিশ্চিন্তমনে অট্টালিকায় উপবিষ্ট হন, তখন তিনি বুঝিতে পারিবেন যে তাদৃশী অবস্থাতেও তিনি প্রকৃত সুখী হয়েন নাই । তাঁহার অন্তঃকরণ যেন আরও কিছু পাইবার আশা করে। যাবৎ সেই আশা পূর্ণ না হয়, তাবৎ তাঁহার প্রকৃত সুখ পাইবার সম্ভাবনা নাই। সেই আশা “ ধৰ্ম্ম জিজ্ঞাসা” এবং সেই আশার বিষয় “ ধৰ্ম্ম ” ব্যতিরেকে আর কিছুই নহে । এইরূপে ধৰ্ম্মপ্রবৃত্তির উদ্রেক হইলেই, প্রচলিত ধৰ্ম্মা- মুষ্ঠানপ্রণালীসকলের মধ্যে কোটী উৎকৃষ্ট কোন্‌টী বা নিকৃষ্ট, তাহা জানিবার ইচ্ছা মানব মনে স্বতঃই উপস্থিত হয় । বৰ্ত্তমান সময়ে পৃথিবীতে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীষ্টিয় প্রভৃতি বিবিধ ধৰ্ম্ম বা ধৰ্ম্মানুষ্ঠান-প্রণালী প্রচলিত আছে। যাঁহারা ঐ সকল সংবাদ জানেন, অথবা তত্তদ্ধর্ম্ম বিষয়ক কোন কোন গ্রন্থ পাঠ করিয়াছেন, তাঁহারা একবার সেই সকল ধর্ম্মের বলাবল বিচার করিতে চান, তাহার সন্দেহ নাই ৷

“স্বধর্ম্মে নিধনং শ্রেয়ঃ

পরধর্ম্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ। ” 

( অর্থাৎ ) উৎকৃষ্ট রূপে পরধর্ম্মের অনুষ্ঠান অপেক্ষা স্বধর্ম্মে থাকিয়া যদি নিধন প্রাপ্ত হইতে হয়, তাহাও শ্রেয়ঃ-

কল্প ।

ইত্যাদি শাস্ত্রীয় শাসন বাক্য সকল আমাদিগের মস্তকো- পরি যতই বলবৎ থাকুক না, আমাদিগকে ধৰ্ম্মান্তরের আলো- চনা করিতে দেখিয়া আমাদিগের অভিভাবক মহাশয়েরা যতই বিরক্ত হউন না, সামাজিক-শাসন আমাদিগের উপরি যতই কর্তৃত্ব করুক না, আমাদিগের মন এমনই স্বাধীন যে, তাহা সকল শাসনকে অতিক্রম করিয়া অন্ততঃ নির্জ্জনে বসিয়াও একবার চিন্তা করিবে, যে চিরপ্রচলিত হিন্দুধৰ্ম্মই উৎকৃষ্ট, অথবা নব্য পরিচ্ছদে পরিশোভিত প্রচলিত ব্রাহ্ম ধৰ্ম্মই উৎকৃষ্ট, কিম্বা হিন্দু-ধৰ্ম্ম সমদ্ভ‚ত বৌদ্ধ ধৰ্ম্মই উৎকৃষ্ট ? কাহারই এরূপ ক্ষমতা নাই যে, এরূপ স্বাধীন চিন্তার ব্যাঘাত করে।

আমাদিগের মনের ঐরূপ স্বাধীন চিন্তার এই ফল হয়, যে যাঁহার জ্ঞান ও বুদ্ধির যেরূপ সীমা, অথবা যাঁহার যেরূপ প্রকৃতি বা মনোবৃত্তি, তিনি তদুপযোগিনী ধৰ্ম্ম-প্রণালীকেই উৎকৃষ্ট বলিয়া সিদ্ধান্ত করেন ৷

শারীরিক পরিচ্ছন্নতা, উপভোগস্পৃহার চরিতার্থতা এবং

। ভগবদ্গীতা উপনিষদ্ ।


অপরাধীনতা অব্যাহত থাকিবে, অথচ একটা অপেক্ষাকৃত সহজ সাধ্য ধর্ম্মের অনুষ্ঠান হইবে, যাঁহাদিগের এরূপ প্রবৃত্তি, অথবা জ্ঞান ও বুদ্ধির এই পর্য্যন্ত সীমা, তাঁহারা হয়ত প্রচলিত নব্য- ব্রাহ্ম ধর্ম্ম বা “স্বেচ্ছাচার” ধর্ম্মের মোহিনী শক্তিতে আকৃষ্ট হন। আবার যাঁহার পরদুঃখ হরণেচ্ছা-প্রবৃত্তি অতিশয় বলবতী, তিনি দেখিতে পান যে, কি হিন্দু, কি খ্রীষ্টিয়, কি মুসলমান, কি নব্য ব্রাহ্ম ধর্ম্ম, সর্ব্বত্রই পশ্বাদির জীবন-বিনাশের ব্যবস্থা রহিয়াছে, অথবা তদ্বিষয়ে বিশেষ নিষেধ নাই ৷ তিনি,

 “অহিংসা পরমো ধৰ্ম্ম।”

( অর্থাৎ ) জীবের প্রতি হিংসা না করাই উৎকৃষ্ট ধৰ্ম্ম, এই ধর্ম্ম-সূত্র যে বৌদ্ধ ধর্ম্মের মূল, তাহারই দিকে আকৃষ্ট হন। এইরূপে চিরকাল এক ধর্ম্মাবলম্বী ব্যক্তিগণও আপন আপন প্রকৃতির দাসত্ব রক্ষা করিতে গিয়া ধর্মান্তর অবলম্বন করিয়াছেন । ফলতঃ স্বাধীন ভাবে ধৰ্ম্মানুষ্ঠান প্রবৃত্তি হইতে যে যে সিদ্ধান্ত উপস্থিত হইতেছে, তাহা সমভাবাপন্ন নহে। স্থূলতঃ উহা দুই প্রকার। গভীর-বুদ্ধিতে প্রকৃতপক্ষে ধর্ম্ম জিজ্ঞাসার একবিধ ফল ; চঞ্চল-বুদ্ধিতে ধর্ম্ম পরিবর্তন চেষ্টার অন্যবিধ ফল। শেষোক্ত প্রণালীতে ধর্ম্মের বিশ্ব- জ্বালাই উপস্থিত হয় ।

উপরি বর্ণিত প্রকারে স্বাধীন ভাবে ধর্ম্ম চর্চ্চা করিতে গিয়া পৃথিবীস্থ যাবতীয় বুদ্ধিমান তত্ত্বানুসন্ধায়ী ব্যক্তি যে কিছু ধৰ্ম্ম প্রণালী অবলম্বন করিয়াছেন বা করিতেছেন,

প্রকৃত পক্ষে তাহা ভারতবর্ষীয় আর্য্যধর্ম্ম বা হিন্দুধর্ম্ম ব্যতি রেকে আর কিছুই নহে।

পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম্মাবলম্বী বুদ্ধিমান্ ব্যক্তিরা যতই ধর্ম্ম-চর্চ্চা করিতেছেন, আপনাদিগের অবলম্বিত ধর্ম্মের যতই সংস্কার করিতেছেন, ততই তাহা হিন্দুধর্ম রূপে পরিণত হইয়া আসিতেছে ।

ধৰ্ম্ম

হিন্দুধর্ম্ম কাহাকে বলে, ইহার সূত্র করিতে হইলে, অগ্রে ধর্ম্ম-পদার্থের লক্ষণ নির্দেশ আবশ্যক হইয়া উঠে। কাহাকে বলে ? এই প্রশ্নের উত্তর ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ী ব্যক্তি- গণ ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রদান করিতে পারেন ; কিন্তু “জগদীশ্বরের অভিপ্রেত কাৰ্য্যই ধর্ম্ম” এরূপ সূত্র সর্ব্ববাদি-সম্মত, তাহার সংশয় নাই । বেদ, স্মৃতি, পুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্রানুযায়ী ধৰ্ম্মকে অর্থাৎ ঐ চতুর্বিধ শাস্ত্রে সামঞ্জস্যরূপে জগদীশ্বরের যে রূপ অভিপ্রায় ব্যক্ত হইতেছে, তাহাকে “হিন্দুধৰ্ম্ম” বলা যায় । “হিন্দু” এই শব্দের ব্যুৎপত্তি বিষয়ে ভাষাতত্ত্ববিৎ পণ্ডিত- গণের ভিন্ন ভিন্ন মত আছে ।

ফলতঃ ভারতবর্ষবাসী আর্য্য- জাতিরই নামান্তর হিন্দু, এ বিষয়ে মত-ভেদ নাই । হিন্দুধৰ্ম্ম বা সনাতন বৈদিকধৰ্ম্ম পৃথিবীতে কত কাল : উৎপন্ন হইয়াছে, এ বিষয়ে অদূরদর্শী ব্যক্তিদিগের সিদ্ধান্ত কোন মতে “হিন্দু” শব্দটি সংস্কৃত ও চির প্রচলিত। অন্যমতে প্রাচীন ইংরাজী ভাষাতে “ হেন্দু ” শব্দের অপভ্রংশ। ভারতবর্ষের উপাসক সম্প্রদায় পুস্তক দেখ । একরূপ, + প্রকৃত তত্ত্বানুসন্ধায়ী দূরদর্শী ব্যক্তিগণের সিদ্ধান্ত অন্যরূপ। হিন্দুধর্ম্ম-প্রতিপাদক বেদশাস্ত্র যে ভাষায় রচিত, তাহার জন্মকাল নির্ণয় করিতে গিয়া পৃথিবীতে প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ ভাষাতত্ববিৎ পণ্ডিতগণের মস্তক বিঘূর্ণিত হইয়াছে। আবার বেদ শাস্ত্র যখন গ্রন্থাকারে পরিণত ছিল না, “শ্ৰুতি” নামে গুরু-পরম্পরায় উপদিষ্ট হইয়া আসিতে ছিল, সেই সময়ের নির্দেশ কে করিতে পারে ? ফলতঃ সনাতন হিন্দুধৰ্ম্ম কতকাল উৎপন্ন হইয়াছে, তাহার স্থিরতা নাই। ইহা অনন্তপ্রায় সুদীর্ঘ- কাল পৃথিবীতে বিদ্যমান রহিয়াছে ।

এক্ষণকার অতি প্রামাণিক ভাষা-তত্ত্ব-বিদ্যা দ্বারা সপ্রমাণ হইয়াছে যে, বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে যত প্রকার ভাষা প্রচ- লিত আছে, বৈদিক ভাষা তাহার মূলস্বরূপ এবং যত প্রকার ধৰ্ম্ম প্রচলিত আছে, সে সকল একমাত্র আর্য্যধর্ম্মের রূপান্তর মাত্র। দেশ, কাল ও পাত্র ভেদে কোথাও কেবল রূপান্ত - রিত, কোথাও বিকৃত, কোথাও অর্দ্ধ-বিকৃত ভাবে পরিণত হইয়াছে ৷অতি পূর্ব্বে ভারতবর্ষীয় আর্য্য-জাতি বা হিন্দুজাতি ধৰ্ম্ম বিস্তার, রাজ্য-বিস্তার ও বাণিজ্য-বিস্তারাদি উপলক্ষে পৃথিবীর বর্তমান চারি মহাদেশে যাতায়াত করিতেন। সুতরাং “অতি পূর্ব্বে হিন্দুধর্ম্মও আংশিকরূপে সমস্ত পৃথিবী ব্যাপ্ত হইয়া- কোলব্রুক সাহেবের মতে খৃষ্টাব্দের ১৪০০ বৎসর পূর্ব্বে বেদ রচিত হয় । খৃষ্টধর্ম্মাবলম্বী অনেকের সিদ্ধান্ত যে, ৫ হাজার বৎসর সময়ের মধ্যে। ছিল, এরূপ অনুমান চিন্তাশীল ব্যক্তিগণের নিকট শ্রদ্ধেয় হইয়াছে ।

হিন্দুজাতির সমস্ত পৃথিবীতে যাতায়াত বিষয়ে, মহাভারত রামায়ণ, ভাগবত, মৎস্য পুরাণ, রাজতরঙ্গিণী ইত্যাদি ইতি- হাস গ্রন্থ, দেশপর্যটক পুরাণ-পুরী নামক সন্ন্যাসীর বর্ণনা এবং ভূগর্ভ হইতে প্রাপ্ত প্রাচীন কালীন তাম্র ফলকাদি ও ভিন্ন ভিন্ন ভাষার অন্যান্য ইতিহাস গ্রন্থ সকল স্বাক্ষ্য প্রদান করে।

মৎস্য পুরাণে বর্ণিত আছে যে, সূৰ্য্যবংশীয় ইক্ষ্বাকু রাজার ১১৫ পুত্র মেরু পর্বতের উত্তরে এবং ১১৪ পুত্র মেরু পর্ব্বতের দক্ষিণে রাজ্য করেন।

রামায়ণ আদিকাণ্ড ৬২ সর্গে কথিত হইয়াছে যে, পরশু - রাম সুমেরু পর্ব্বতে তপস্যা করিতেন।

বিষ্ণুপুরাণের বর্ণনানুসারে প্রতিপন্ন হয় যে, আধুনিক ক্ষুদ্র বোখারা দেশস্থ উন্নত পৰ্ব্বতই পৌরাণিক “সুমেরু পৰ্ব্বত।” ভূগর্ভ হইতে প্রাপ্ত তাম্রফলক দ্বারা প্রতিপন্ন হইয়াছে, যে জেনিসি নদীর তীরস্থ কৃষ্ণজস্ক নগরে ইক্ষ্বাকুবংশের রাজ ধানী ছিল ।

মহাভারতের বর্ণনানুসারে পাণ্ডু-পুত্র ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব বৰ্ত্তমান আসিয়া মহাদেশের প্রায় সকল দেশই জয় করিয়াছিলেন ।

পুরাণ পুরী নামক সন্ন্যাসী আসিয়ার ব্রহ্মদেশ হইতে ইউরোপীয় রুসিয়ার মস্কো নগর পর্য্যন্ত ভ্রমণ করেন। তিনি লিখিয়াছেন যে, “তুরঙ্ক” দেশের বসোরা নগরে “কল্যাণ রাও” ও “গোবিন্দ রাও” নামক দুই দেবমূৰ্ত্তি আছে ৷ “পারস্য” দেশের হিঙ্গুলাজ নগরে, “তাতার” দেশের বার্থ নগরে, আসিয়িক রুসিয়ার আষ্ট্রীকান নগরে, এবং জাবা- দ্বীপ, বালিদ্বীপ ও খরক উপদ্বীপে বহুতর হিন্দু বাস করিতেছেন ।

রোম দেশীয় পণ্ডিত স্ত্রাবো ও ডাইরে৷ লেখেন, যে খ্রীষ্টাব্দের ২০ বৎসর পূর্ব্বে পণ্ডিয়ন রাজা রোমীয় সম্রাট আগষ্টস সীজরের নিকট যে দূত প্রেরণ করেন, তাহার মধ্যে এক জনের নাম “খড়গ শৰ্ম্ম।” ।

১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দে ইংলণ্ডের কোন স্থানে মৃত্তিকা মধ্যে সংস্কৃত ভাষায় লিখিত যে তাম্রফলক পাওয়া গিয়াছে, তাহাতে প্রতিপন্ন হয় যে, খ্রীষ্টাব্দের ২২০০ বাইশ শত বৎসর পূর্ব্বে হিন্দুজাতি ইউরোপে বাণিজ্য করিতে যাইতেন। ঐ তাম্রফলক এক্ষণে ইংলণ্ডের চিত্রশালিকায় আছে ৷

বিশ্ব-ইতিহাস-লেখক টাইটেলার এবং প্রসিদ্ধ ফরাসি পণ্ডিত মনসেয়ার বেলী লেখেন যে, আফরিকা মহাদেশস্থ ঈজিপ্ট ও কালডিয়া দেশে যে যে বিদ্যা প্রচলিত আছে, ভারতবর্ষই তাহার বিদ্যালয়স্বরূপ ।

পুরাণশাস্ত্রে বর্ণিত আছে যে, বলিরাজা ও পুরুবংশীয় মহাভারতের

কোন কোন রাজা পাতালে বাস করিতেন।

বর্ণনা এই যে, ভীমসেন পাতালে গমন করেন। বৰ্ত্তমান সময়ের প্রচলিত ভূগোল-শাস্ত্রে নির্দিষ্ট হইতেছে যে, আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণ অংশে দুইটী প্রদেশের নাম পুরুভিয়া ও বলিভিয়া। তথাকার অধিবাসীরা আচার ব্যবহা রাদি বিষয়ে অনেকাংশে হিন্দুজাতির সদৃশ। তাহারা অদ্যাপি রাম-সীতার পূজা করিয়া থাকে ।

সংস্কৃত ভাষায় “পাত” শব্দের একটী অর্থ — উর্দ্ধাধভাবে অবস্থিত । ব্যাকরণের যে সূত্রানুসারে বাচ্ শব্দ হইতে “বাচাল” শব্দ সিদ্ধ হয়, সেই সূত্র অনুসারে “পাত” শব্দ হইতে “পাতাল” শব্দ সিদ্ধ হইতে পারে। পৌরাণিক বর্ণনা, পাতাল শব্দের ব্যুৎপত্তি এবং আমেরিকার প্রচলিত ভূগোল বৃত্তান্ত একত্র অনুধাবন করিতে গেলে, ইহাই প্ৰতিপন্ন হয় যে আধুনিক আমেরিকা নামক স্থানই পূর্ব্বকালে “পাতাল” শব্দে নির্দিষ্ট হইয়াছিল; এবং সংস্কৃত “পুরুভূমি” শব্দের অপভ্রংশে পুরুভিয়া ও “বলিভূমি” শব্দের অপভ্রংশে বলিভিয়া শব্দ উৎ- পন্ন হইয়াছে। ফলতঃ যে হিন্দুজাতি জ্যোতিঃশাস্ত্রে পৃথিবীকে কদম্বকুসুমাকার পদার্থ বলিয়া নির্ণয় করিয়াছেন, আমেরিকাই যে তাঁহাদিগের পাতাল, তদ্বিষয়ে সন্দেহের কারণই নাই ৷

এই সকল ও এতাদৃশ অন্যান্য প্রমাণ প্রয়োগ দৃষ্টি করিলে, তত্ত্বজিজ্ঞাসু ব্যক্তিগণ স্বীকার করিতে বাধ্য হন যে, পূৰ্ব্ব- কালে সমস্ত পৃথিবীতেই হিন্দু জাতি ও হিন্দুধর্ম্ম পরিব্যাপ্ত হইয়াছিল ৷

আদিম কালীন হিন্দু জাতীয় ব্যক্তিরা চরম জ্ঞানী, চরম 'ধার্ম্মিক এবং প্রায় চরম সভ্য হইয়াছিলেন।

অদ্বিতীয় তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও অদ্বিতীয় আধ্যাত্মিক তত্ত্বালোচনার পরিচায়ক বেদশাস্ত্র, উপনিষৎ শাস্ত্র এবং দর্শন শাস্ত্র সকল তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ ৷

মানববুদ্ধির অদ্বিতীয় গৌরবের সামগ্রী, সারবান্ প্রকৃত “ব্রাহ্মধর্ম্ম” হিন্দু জাতিরই জ্ঞানচর্চ্চা হইতে সমদ্ভূত।

হিন্দু জাতি কেবল ব্রাহ্মধর্ম্মের সৃষ্টি করিয়াই ক্ষান্ত হয়ে ন নাই। তাঁহারা অপরিত্যজ্যবৎ, সংসারের মায়া পরিত্যাগ করিয়া সহাস্যবদনে কৌপীন ধারণ পূর্ব্বক বনবাস-আশ্রয় করিতেন ; সমুদ্রবৎ বিস্তৃত হিন্দুশাস্ত্র সকল তাহা উচ্চৈঃস্বরে ব্যক্ত করিতেছে।

শাস্ত্রে প্রমাণিত হইতেছে যে, সভ্যতাসাধনের উপ- করণ স্বরূপ ব্যোমযান, দূরবীক্ষণ, গ্লোব, ঘটিকা, তাপমান, বায়ুমান এবং দিগ্দর্শন যন্ত্র প্রথমে হিন্দ জাতিই সৃষ্টি করিয়া- ছিলেন।

তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, কুসংস্কার-রহিত জ্ঞান, মার্জিত ধর্ম্ম এবং পরিশুদ্ধরূপ কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্প কার্য্যই প্রকৃত সভ্যতা নামক পদার্থের উপাদান। জ্ঞানচক্ষে অবলোকন করিলে আদিম হিন্দু জাতিতে ঐ সকলেরই বিদ্যমানতা দেখা যায় ৷

■ সংস্কৃত ভাষায় উল্লিখিত “শিল্প সংহিতা” এবং “সূর্য্য সিদ্ধান্ত” গ্রন্থে ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়।




No comments

Theme images by Airyelf. Powered by Blogger.